অনুসন্ধান করুন

মৌখিক স্মৃতির মহাকাব্য: উসমানীয় ছায়ায় সার্বিয়ার প্রজ্ঞাবাণী


সার্বিয়ান প্রবাদগুলি শুধু সংক্ষিপ্ত নীতি বাণী নয়, এগুলো একটি জাতির স্মৃতিতে খোদাই হওয়া ইতিহাস, দর্শন আর টিকে থাকার গল্পের সুর। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এরা বেড়ে উঠেছে ভূ-রাজনৈতিক বাতাসের সাথে তাল মিলিয়ে, উসমানীয় সাম্রাজ্যের সুদীর্ঘ ছায়ার নিচেও। সেই সময়কে কেবল ‘তুর্কি জোয়াল’ বলা হবে একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি। বরং তা ছিল একটি জটিল সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়ার যুগ, যেখানে প্রজ্ঞা ও শব্দের আদান প্রদানও নিহিত আছে। গ্রামীণ সার্বিয়ার মানসপটে তখনও দৈনন্দিন জীবনের সত্য, কৃষিকাজের কষ্ট আর পারিবারিক বন্ধনের কথা ফুটে উঠত প্রবাদের আকারে, নিজস্ব ভাষায় ও ছন্দে।

ভুক কারাজিচ ছিলেন এক উজ্জ্বল চেতনার মানুষ, যিনি বুঝতে পেরেছিলেন জাতির প্রাণশক্তি লুকিয়ে থাকে তার লোকায়ত জ্ঞানের গভীরে। শহুরে অভিজাতদের দুর্বোধ্য ভাষার বদলে তিনি তুলে আনলেন সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা, তাদের হাজারো প্রবাদ আর গাঁথা। তার এই কাজ ছিল ভাষাকে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক মহৎ অভিযান। ‘যেভাবে বলো, সেভাবে লেখো’ এই সহজ নীতিতে তিনি সার্বীয় লিপি ও ব্যাকরণকে করলেন সহজসাধ্য, যেন লেখায় ও কথায় একই আত্মা বেজে ওঠে।

উসমানীয় সময়ে শহরগুলো হয়তো প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল, কিন্তু সার্বিয়ার গ্রামগুলো হয়ে উঠেছিল সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। সেখানে প্রবাদগুলো সন্তান থেকে সন্তানান্তরে চলে আসত মৌখিক ঐতিহ্যে, সংরক্ষণ করত জাতির স্বকীয়তা। উসমানীয় শাসন ব্যবস্থাও স্থানীয় কিছু প্রথা ও শব্দকে জায়গা দিয়েছিল, যা দুই সংস্কৃতির মধ্যে এক ধরনের সেতু তৈরি করেছিল। এই সহাবস্থান থেকে উঠে আসা জ্ঞানের আলো আজও প্রবাদে উজ্জ্বল।

কোসোভোর যুদ্ধের বীরত্বগাথা সার্বিয়ান চেতনায় এক গভীর আধ্যাত্মিক ছাপ রেখে গেছে। ‘লজ্জাজনক জীবনের চেয়ে বীরের মৃত্যু শ্রেয়’—এই বোধটি জাতির চরিত্রে মিশে আছে। কিন্তু এই চেতনা শুধু যুদ্ধের কথা বলে না, এটি বলতে চায় ন্যায়, আত্মত্যাগ ও বিশ্বস্ততার মর্যাদার কথা। এটি ত্যাগের মাধ্যমে অমরত্ব লাভের এক দার্শনিক শিক্ষা।

সার্বিয়ান প্রবাদের সৌন্দর্য তার সারল্য ও গভীরতায়। ‘ভোরে ওঠো, দুই সৌভাগ্য ধরো’—এ কথা আমাদের বাংলা প্রবাদ ‘যত্নে রত্ন মেলে’ এর মতোই জীবনী শক্তি জোগায়। ‘হাতের চড়ুইটা ডালের কবুতরের চেয়ে ভালো’ মনে করিয়ে দেয় ‘হাতে একটাই নাও, নদীতে ভরসা নয়’ এর মতো বাস্তববোধের কথা। আর ‘নীরব জলই পাহাড় কাটে’ প্রবাদটি তো ‘ধৈর্যের ফল মিষ্টি’ এই সত্যকেই নতুনভাবে দেখায়।

এসব প্রবাদ শিক্ষা দেয় কঠোর পরিশ্রমের মাহাত্ম্য। ‘কোদাল ছাড়া রুটি হয় না’ বা ‘কষ্ট ছাড়া জ্ঞান হয় না’—এই সরল বাক্যগুলো জীবন গড়ার মূলমন্ত্র বলে দেয়। তারা আবার সতর্কও করে—‘অন্যের জন্য যে গর্ত খোঁড়ে, সে নিজেই তাতে পড়ে’—যা আমাদের ‘যে বুনেছে সে কুড়াবে’ প্রবাদেরই প্রতিধ্বনি।

আজকের ডিজিটাল যুগেও এই প্রাচীন প্রজ্ঞার আলো কমেনি। ‘যা চকচক করে, সবই সোনা নয়’—এই কথাটি আজকে ভুয়া সংবাদ আর বহুরূপী পৃথিবীতে আগের চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক। আর সমাজ বদলের আন্দোলনে প্রবাদের শক্তিই ফুটে ওঠে নতুন স্লোগানে—‘দুর্নীতি হত্যা করে’, ‘সবাই অবরোধে’।

সার্বিয়ান প্রবাদ প্রমাণ করে যে, একটি জাতির ভাষা ও মৌখিক ঐতিহ্যই তার সবচেয়ে শক্তিশালী কবচ। ইতিহাসের ঝড়ে অনেক কিছুই ধ্বংস হয়, কিন্তু জ্ঞানের এই মৃদু আলোটি নিভে যায় না। উসমানীয় যুগের প্রলম্বিত ছায়া হোক কিংবা আধুনিক সময়ের জটিলতা— প্রবাদগুলো মানুষের হৃদয়ে আশা ও দিক নির্দেশনার দীপশিখা জ্বালিয়ে রাখে। এগুলো শুধু অতীতের ধ্বনি নয়, বর্তমানের পথপ্রদর্শক ও ভবিষ্যতের স্বপ্নবাহক।

বিভাগ:
লেখকগণ: