আন্তোনিও গ্রামসির নিষ্ক্রিয় বিপ্লব এবং ট্রান্সফর্মিজমো: রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং আধিপত্যের কৌশল
জানুয়ারি ১১, ২০২৬আন্তোনিও গ্রামসির রাজনৈতিক দর্শনের মূল স্তম্ভ হলো 'ওয়ার অফ পজিশন' বা স্থানিক যুদ্ধ, যা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এক গভীর পরিবর্তনের সূচনা করেছে। ১৯২৯ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে ইতালির ফ্যাসিবাদী কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় গ্রামসি তার 'প্রিজন নোটবুক'-এ এই তত্ত্বটি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেন। এই তত্ত্বের মূল উদ্দেশ্য ছিল পুঁজিবাদী ব্যবস্থার স্থায়িত্ব এবং এর সাংস্কৃতিক আধিপত্য বা 'হেজিমনি' বোঝার চেষ্টা করা। গ্রামসি লক্ষ্য করেছিলেন যে, আধুনিক পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোতে ক্ষমতা কেবল পুলিশ বা সামরিক শক্তির ওপর টিকে থাকে না, বরং তা নাগরিক সমাজের গভীর শিকড়ে প্রোথিত থাকে। তার মতে, এই গভীর শিকড়কে উপড়ে না ফেলে কেবল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করা অসম্ভব।
ওয়ার অফ পজিশন মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদী, মন্থর এবং কৌশলগত রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রাম। এর প্রধান লক্ষ্য হলো বিদ্যমান শাসকশ্রেণীর বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানানো এবং একটি বিকল্প আধিপত্য বা 'কাউন্টার-হেজিমনি' তৈরি করা। গ্রামসি একে সামরিক পরিভাষায় 'ট্রেঞ্চ ওয়ারফেয়ার' বা পরিখা যুদ্ধের সাথে তুলনা করেছেন। সামরিক যুদ্ধে যেমন প্রতিটি ইঞ্চি মাটির জন্য লড়াই করতে হয়, ঠিক তেমনি নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন—শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় সংগঠন, গণমাধ্যম, পরিবার এবং শিল্পকলা ক্ষেত্রে বিকল্প মতাদর্শের ভিত্তি তৈরি করাই হলো এই যুদ্ধের মূল কাজ। এটি এমন এক ধরণের যুদ্ধ যেখানে সম্মুখ সমরের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের চিন্তা পদ্ধতি এবং বিশ্ববীক্ষাকে বদলে দেওয়া।
গ্রামসি রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রধানত দুটি রণকৌশল চিহ্নিত করেছেন—'ওয়ার অফ ম্যানুভার' এবং 'ওয়ার অফ পজিশন'। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে তিনি এই দুটির পার্থক্য ব্যাখ্যা করেন। তার মতে, জার শাসিত রাশিয়া ছিল একটি পশ্চাদপদ সমাজ যেখানে রাষ্ট্রই ছিল সর্বেসর্বা এবং সিভিল সোসাইটি ছিল অত্যন্ত দুর্বল বা 'জেলটিনাস'। সেখানে দ্রুত গতিতে সম্মুখভাগ থেকে আক্রমণ বা 'ওয়ার অফ ম্যানুভার' কার্যকর ছিল। কিন্তু উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোতে রাষ্ট্র কেবল বাইরের একটি 'পরিখা' মাত্র, যার গভীরে রয়েছে সিভিল সোসাইটির শক্তিশালী দুর্ভেদ্য দুর্গ। তাই আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সফল হতে হলে আগে 'ওয়ার অফ পজিশন' বা দীর্ঘমেয়াদী সাংস্কৃতিক সংগ্রামে জয়ী হতে হবে, কারণ এই বিজয়ই চূড়ান্ত রাজনৈতিক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে।
শাসকগোষ্ঠী ওয়ার অফ পজিশনকে তাদের ক্ষমতা রক্ষার প্রধান কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে কারণ কেবল শক্তি প্রয়োগ বা দমনের মাধ্যমে দীর্ঘকাল শাসন করা সম্ভব নয়। গ্রামসি দেখিয়েছেন যে, আধিপত্য তখনই সফল হয় যখন শাসিত গোষ্ঠী শাসকের মতাদর্শকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমর্থন জানায় এবং একে নিজেদের স্বার্থ হিসেবেই দেখে। এই সম্মতি উৎপাদন করা হয় শিক্ষা, ধর্ম এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে, যা শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করার সবচেয়ে সাশ্রয়ী পদ্ধতি। এছাড়া অনেক সময় শাসকশ্রেণী নিচ থেকে আসা বৈপ্লবিক দাবিগুলোকে কিছুটা সংস্কার করে নিজেদের ব্যবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়, যাকে গ্রামসি 'প্যাসিভ রেভল্যুশন' বা নিষ্ক্রিয় বিপ্লব বলেছেন। পাশাপাশি তারা প্রায়ই বিরোধী শিবিরের প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবীদের রাষ্ট্রীয় সুবিধা বা সম্মানের বিনিময়ে নিজেদের দলে টেনে নেয়, যা 'ট্রাসফরমিসমো' নামে পরিচিত।
সাংস্কৃতিক আধিপত্য মানুষের মস্তিষ্কের চিন্তা পদ্ধতি এবং দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত গ্রহণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। আধিপত্যবাদীরা মানুষের 'কালেক্টিভ কনশাসনেস' বা সমষ্টিগত চেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ব্যবহার করে। গ্রামসির মতে, মানুষের মধ্যে থাকা 'কমন সেন্স' আসলে সমাজ থেকে শুষে নেওয়া কিছু কুসংস্কার ও খণ্ডিত বিশ্বাসের সমষ্টি, যার ছদ্মবেশে শাসকশ্রেণী তাদের নিজস্ব স্বার্থ ঢুকিয়ে দেয়। এর ফলে 'গরিব হওয়া নিজের কর্মের ফল'-এর মতো ধারণা মানুষের মনে গেঁথে যায় এবং সে আর কাঠামোগত বৈষম্যকে প্রশ্ন করে না। এর বিপরীতে 'গুড সেন্স' বা সুবুদ্ধি হলো সেই সমালোচনামূলক ক্ষমতা যা দিয়ে মানুষ তার বাস্তব অবস্থাকে যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে।
এই আধিপত্য মানুষের মনে 'স্ববিরোধী চেতনা' তৈরি করে। একজন শ্রমিক তার প্র্যাকটিক্যাল কনশাসনেসের মাধ্যমে শোষণের অভিজ্ঞতা পেলেও তার 'ভার্বাল কনশাসনেস' তাকে শেখায় যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটিই শ্রেষ্ঠ। এই দ্বন্দ্বের কারণে মানুষ রাজনৈতিকভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আধিপত্যবাদীরা মিডিয়া এবং শিক্ষার মাধ্যমে বিশেষ কিছু জীবনধারাকে 'স্বাভাবিক' বা নরমালাইজেশন করে তোলে এবং কৃত্রিম সামাজিক স্তরবিন্যাসকে 'প্রাকৃতিক নিয়ম' হিসেবে উপস্থাপন করে। এর ফলে মানুষের মস্তিষ্ক এই বৈষম্যগুলোকে প্রাকৃতিক এবং অপরিবর্তনীয় সত্য বলে মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো গ্রামসির তত্ত্বে আধিপত্য রক্ষার 'পরিখা ও দুর্গ' হিসেবে কাজ করে। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা শাসকশ্রেণীর আধিপত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম এমনভাবে সাজানো হয় যেখানে শাসকশ্রেণীর ইতিহাসকে মহিমান্বিত করা হয় এবং প্রান্তিক মানুষের অবদানকে তুচ্ছ করা হয়। শিক্ষকরা এখানে 'বৈধকরণের বিশেষজ্ঞ' হিসেবে কাজ করেন যারা শিক্ষার্থীদের অবচেতনে বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য তৈরি করেন। গ্রামসি একে 'স্কুল-টু-ফ্যাক্টরি পাইপলাইন' বলেছেন, যেখানে শিক্ষার্থীদের কেবল একটি দক্ষ এবং অনুগত শ্রমশক্তিতে রূপান্তর করা হয়। এছাড়া নির্দিষ্ট ভাষা এবং আচরণকে 'উন্নত' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে শাসকশ্রেণীর ভাষাকেই সফলতার মাপকাঠি করা হয়, যা অন্য সংস্কৃতিকে প্রান্তিক করে তোলে।
একবিংশ শতাব্দীতে ওয়ার অফ পজিশনের সবচেয়ে সক্রিয় রণক্ষেত্র হলো ডিজিটাল মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। বর্তমানে মানুষ তার প্রকৃত সত্তার চেয়ে অনলাইন প্রোফাইলের ইমেজের ওপর বেশি নির্ভর করে, যা 'প্রোফাইলিসিটি' নামে পরিচিত এবং এটি মানুষের নিজস্ব চিন্তার গভীরতাকে ধ্বংস করে। অ্যালগরিদমিক ফিল্টারিং মানুষকে 'ইকো চেম্বার'-এর মধ্যে বন্দি রাখে এবং বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গিকে বাধা দেয়। এছাড়া বট একাউন্টের মাধ্যমে কৃত্রিম জনমত তৈরি এবং শ্যাডো ব্যানিংয়ের মাধ্যমে ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠরোধ করা হয়। ডিজিটাল আধিপত্য কেবল তথ্য নয়, মানুষের আবেগকেও নিয়ন্ত্রণ করে। সোশ্যাল মিডিয়ার 'ভ্যালিডেশন ফিডব্যাক লুপ' মানুষকে মনে করায় সে স্বাধীন, কিন্তু আসলে সে একটি বিশাল অ্যালগরিদমিক কারখানার শ্রমিক।
গ্রামসির দর্শনে 'ঐতিহাসিক ব্লক' হলো এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং উপরিকাঠামো (সংস্কৃতি, রাজনীতি, আইন) একে অপরের সাথে একীভূত হয়ে একটি স্থিতিশীল ব্যবস্থার জন্ম দেয়। একটি নতুন ঐতিহাসিক ব্লক তৈরি করার জন্য সেই শ্রেণীর নিজস্ব 'অর্গানিক বুদ্ধিজীবী' প্রয়োজন। এরা কেবল গ্রন্থকীট নন, বরং শ্রমিক বা কৃষকদের প্রতিদিনের লড়াইকে একটি সুসংগত রাজনৈতিক দর্শনে রূপ দেন। ওয়ার অফ পজিশন এই মতাদর্শিক ভিত্তি তৈরি করে এবং বিভিন্ন শ্রেণী ও গোষ্ঠীর স্বার্থকে একত্রিত করে একই রাজনৈতিক লক্ষ্যের অধীনে নিয়ে আসে।
সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন প্রান্তিক ও শোষিত শ্রেণি থেকে উঠে আসা অর্গানিক বুদ্ধিজীবীরা, যারা গ্রামসির ভাষায় ‘পারমানেন্ট পারসুয়েডর’ হিসেবে জনগণের চেতনা নির্মাণে সক্রিয় থাকেন। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে গণশিক্ষার পরিসর গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা সম্ভব হয়। গ্রামসির ‘প্রাক-আলংকারিক’ রাজনীতির ধারণা অনুযায়ী, বিপ্লবের ভবিষ্যৎ অপেক্ষা না করে বর্তমান সমাজের ভেতরেই শ্রমিক সমবায় বা বিকল্প পাঠাগারের মতো প্রতিষ্ঠান নির্মাণের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ সমাজের বীজ রোপণ করা হয়।
গ্রামসির ‘ওয়ার অফ পজিশন’ ধারণা রাজনৈতিক রূপান্তরকে ক্ষমতার সরল স্থানান্তরের বাইরে একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম হিসেবে চিহ্নিত করে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আধিপত্য কখনোই সম্পূর্ণ বা চূড়ান্ত হতে পারে না; প্রতিটি আধিপত্যের কাঠামোর মধ্যেই অন্তর্নিহিত সংকট ও ফাটল বিদ্যমান। অর্থনৈতিক বিপর্যয় বা নৈতিক বৈধতার সংকটে এই ফাটলগুলো বিস্তৃত হয়। এই দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়াই এক ধরনের ‘দীর্ঘ পদযাত্রা’, যা সমকালীন ডিজিটাল ও বৈশ্বিক পুঁজিবাদী বাস্তবতায়ও সমাজ রূপান্তরের একটি কেন্দ্রীয় কৌশল হিসেবে প্রাসঙ্গিক।