শান্তির নোবেল ও যুদ্ধের অভিযোগ: ওবামার বৈদেশিক নীতির পরস্পরবিরোধিতা
ডিসেম্বর ২৩, ২০২৫বারাক ওবামার রাষ্ট্রপতিত্ব (২০০৯-২০১৭) মার্কিন ইতিহাসের একটি আলোচিত, প্রভাবশালী ও বিতর্কিত অধ্যায়। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪তম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তার শাসনামল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী সময়। তার রাষ্ট্রপতিত্ব কেবল মার্কিন রাজনীতিতেই নয়, বিশ্বজুড়ে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। তার শাসনামলে মার্কিন অর্থনীতি ২০০৮ সালের বিশ্ব আর্থিক মন্দা থেকে পুনরুদ্ধার লাভ করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে লক্ষ্যভিত্তিক হামলা এবং বৈদেশিক সংঘাতে জড়িততার কারণে আন্তর্জাতিক মহল তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে।
বারাক হুসেইন ওবামা ১৯৬১ সালের ৪ আগস্ট হাওয়াইয়ের হনুলুলুতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা কেনিয়ার একজন অর্থনীতিবিদ এবং মা ক্যানসাসের একজন শ্বেতাঙ্গ নৃবিজ্ঞানী ছিলেন। তার শৈশব হাওয়াই ও ইন্দোনেশিয়ায় কাটে, যা তাকে শৈশব থেকে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও বিশ্ববীক্ষার সংস্পর্শে আনে। তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক এবং হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। হার্ভার্ডে থাকাকালীন তিনি 'হার্ভার্ড ল রিভিউ'-এর প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে নজর কাড়েন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি শিকাগোয়েতে একজন কমিউনিটি অর্গানাইজার হিসেবে দরিদ্র মানুষের আবাসন ও কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণের জন্য কাজ করেন, যা তার রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি তৈরি করে।
তার রাজনৈতিক উত্থান দ্রুত ঘটে। ১৯৯৬ সালে ইলিনয় থেকে সিনেটে নির্বাচিত হন এবং ২০০৪ সালে মার্কিন সিনেটে একটি বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেন। ২০০৪ সালের ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কনভেনশনে তার মূল ভাষণ তাকে জাতীয় তারকায় পরিণত করে। ২০০৮ সালে 'আশা' (Hope) ও 'পরিবর্তন' (Change)-এর লেবেলে নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়ে ডেমোক্র্যাটিক মনোনয়ন ও রিপাবলিকান জন ম্যাককেইনকে সাধারণ নির্বাচনে পরাজিত করে হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেন।
অভ্যন্তরীণ নীতি ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রসঙ্গে, ওবামা যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন মার্কিন অর্থনীতি ১৯৩০-এর দশকের 'গ্রেট ডিপ্রেশন'-এর পর সর্বাধিক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। আবাসন খাতের বুদ্বুদ ফেটে যাওয়া এবং ওয়াল স্ট্রিটের ব্যাংকগুলির ধসে প্রায় ৯ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান চলে যায়। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ওবামার প্রথম বড়ো উদ্যোগ ছিল অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি 'আমেরিকান রিকভারি অ্যান্ড রিইনভেস্টমেন্ট অ্যাক্ট' (ARRA) স্বাক্ষর করেন, যা ছিল ৭৮৭ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ। এই প্যাকেজের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাতে অভূতপূর্ব বিনিয়োগ করা হয়। পাশাপাশি তিনি অটোমোবাইল শিল্পকে বাঁচাতে বিশেষ বেইলআউট প্যাকেজ ঘোষণা করেন, যা জেনারেল মটরস এবং ক্রাইসলারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেউলিয়া হওয়া থেকে রক্ষা করে এবং প্রায় ১০ লাখ মানুষের চাকরি বাঁচায়।
স্বাস্থ্য সংস্কার প্রসঙ্গে, ওবামার অভ্যন্তরীণ নীতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও বিতর্কিত অংশ ছিল 'অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট' (ACA), বা 'ওবামাকেয়ার' নামে পরিচিত। ১৯৪৫ সালে হ্যারি ট্রুম্যানের পর থেকে প্রতিটি ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্ট সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার চেষ্টা করলেও, ওবামাই প্রথম এই বিশাল সংস্কারটি পাশ করাতে সক্ষম হন। এই আইনের মাধ্যমে মার্কিন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা হয় : পূর্ববর্তী অসুস্থতার কারণে বিমা কোম্পানিগুলো আর বিমা প্রদান অস্বীকার করতে পারবে না; তরুণরা এখন ২৬ বছর বয়স পর্যন্ত তাদের বাবা-মায়ের স্বাস্থ্য বিমার অধীনে থাকতে পারবে; নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে মেডিকেয়িডকে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ করা হয়; এবং বিমা কোম্পানিগুলো বার্ষিক বা আজীবন কভারেজের উপর ক্যাপ আরোপ করতে পারবে না এবং প্রতিষেধকমূলক যত্ন বা টিকাদান বিনামূল্যে প্রদান করতে বাধ্য থাকবে। এই সংস্কারের ফলে প্রায় ২ কোটি আমেরিকান নতুন করে স্বাস্থ্য বিমার আওতায় আসে এবং আমেরিকার বিমা ছাড়া মানুষের সংখ্যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। তবে এটি রিপাবলিকানদের পক্ষ থেকে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে, যারা এটিকে সরকারের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর হুমকি হিসেবে বর্ণনা করে।
বৈদেশিক নীতিতে, বারাক ওবামার নীতি ছিল তার পূর্বসূরি জর্জ ডব্লিউ বুশের 'একতরফা যুদ্ধ' (Unilateralism) থেকে সরে এসে বহুপক্ষীয় কূটনীতি এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সমাধানের অবলম্বনের এক মিশ্রিত প্রস্তাব। তবে তার এই 'শান্তির নীতি' অনেক ক্ষেত্রেই ড্রোন হামলার মাধ্যমে নতুন ধরনের যুদ্ধের প্রসারণের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
তার ঐতিহাসিক কূটনৈতিক অর্জনের মধ্যে রয়েছে : ইরান পরমাণু চুক্তি (JCPOA), যা দীর্ঘ আলোচনার পর ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে সীমাবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরিত হয়; কিউবার সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ, যার মাধ্যমে প্রায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলা শীতল যুদ্ধের বৈরিতা কাটিয়ে ওঠা হয়; প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, যা জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবেলায় ১৯৫টি দেশের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি বিশ্বব্যাপী চুক্তিতে পৌঁছানো ওবামার ব্যক্তিগত অঙ্গীকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল; এবং ওসামা বিন লাদেনের নির্মূল, যা ২০১১ সালে পাকিস্তানে এক ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমে ৯/১১ হামলার ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করা হয়।
প্রেসিডেন্ট ওবামাকে অনেকেই যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিহিত করেন মূলত তার প্রশাসনের মাধ্যমে লক্ষ্যভিত্তিক হামলার (Targeted Killings) ব্যাপক প্রয়োগের জন্য। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী, ওবামা তার পূর্বসূরি বুশের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি ড্রোন হামলা পরিচালনা করেছিলেন। তার আমলে ড্রোন হামলার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া ও আফগানিস্তানে মোট ৫৬৩টি ড্রোন হামলা হয়, যাতে আনুমানিক ৩,৭৯৭ জন নিহত হন। এদের মধ্যে ৩৮৪ থেকে ৮০৭ জন ছিলেন বেসামরিক (মানবাধিকার সংস্থার দাবি অনুযায়ী), এবং সরকারি হিসাবে বেসামরিক নিহতের সংখ্যা ৬৪ থেকে ১১৬ জন। তাকে যুদ্ধাপরাধী বলা হয় এরকম কিছু উল্লেখযোগ্য অভিযোগের ভিত্তিতে : প্রথমত, ড্রোন হামলার ভুল পরিচালনা : ড্রোন হামলার নভোচারিতার দাবি সত্ত্বেও পাকিস্তান এবং ইয়েমেনে শত শত বেসামরিক মানুষ, এমনকি গর্ভবতী নারী ও শিশুও এই হামলায় নিহত হয়। ২০১১ সালে ইয়েমেনে একটি বিবাহ অনুষ্ঠানে ড্রোন হামলা এবং ২০১৫ সালে কুন্দুজে 'ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস' হাসপাতালে হামলা (এসি-১৩০ গানশিপ দ্বারা) আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। দ্বিতীয়ত, 'ডাবল ট্যাপ' প্রক্রিয়া : প্রথম হামলার পর যখন স্থানীয় জনগণ বা উদ্ধারকারীরা আহতদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসে, তখন দ্বিতীয়বার হামলা চালানোকে অনেক আইন বিশেষজ্ঞ যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করেন। তৃতীয়ত, বেআইনি হত্যাকাণ্ড : ক্যাপ্টিভ নিশানা তৈরির প্রক্রিয়ায় জড়িত ব্যক্তিদের সন্দেহভিত্তিক ড্রোন হামলায় হত্যা করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন। বিশেষ করে ২০১১ সালে ইয়েমেনে মার্কিন নাগরিক আনোয়ার আল-আওলাকিকে ক্যাপ্টিভ নিশানা হিসেবে হত্যা করার মাধ্যমে ওবামা তার নিজের নির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক আইন উভয়ই লঙ্ঘন করেন। চতুর্থত, সিরিয়া ও লিবিয়ায় পরিস্থিতি : আরব বসন্তের ২০১১ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর সিরিয়া ও লিবিয়ায় নেমে আসা অরাজকতা এবং সরকারবিরোধী বাহিনীর নৃশংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারায় ওবামার বৈদেশিক নীতির বড়ো ব্যর্থতা দেখা যায়।
অন্যদিকে, বারাক ওবামার জনপ্রিয়তা ছিল তার অনন্য ব্যক্তিত্ব, বাগ্মিতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির উপর ভিত্তি করে। তার সমর্থকরা তাকে একজন রূপান্তরমূলক নেতা হিসেবে দেখেন। ওবামাকে পছন্দ করার কয়েকটি সহজ কারণ আছে। তিনি সামাজিক ন্যায়বিচার ও বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি আমেরিকার নানা জাতি ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি সেনাবাহিনীতে এলজিবিটি সদস্যদের কাজের সুযোগ দেন এবং সমকামী বিবাহকে বৈধ করেন যদিও এর জন্য তিনি সমালোচনার সম্মুখীন হন। তিনি অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করেন। অর্থনৈতিক সংকটের পর আমেরিকার ভেঙে পড়া অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে এবং অনেক মানুষ স্বাস্থ্য বিমার সুবিধা পায়। তার শাসন ছিল তুলনামূলকভাবে কলঙ্কমুক্ত। টানা আট বছর ক্ষমতায় থেকেও তিনি বড় কোনো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক কেলেঙ্কারিতে জড়াননি, যা খুবই বিরল। তিনি পরিবেশ রক্ষায় কাজ করেছেন। বিপুল পরিমাণ জমি ও জলাভূমি সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে তিনি প্রকৃতি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ৯ মাসের মধ্যে বারাক ওবামাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। নোবেল কমিটি তার পুরস্কার প্রদানের জন্য যে কারণগুলো উল্লেখ করে : আন্তর্জাতিক কূটনীতি : বহুপক্ষীয় কূটনীতি এবং বিভিন্ন দেশের মধ্য সহযোগিতা বৃদ্ধির অসাধারণ প্রস্তাব। পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ : পরমাণু অস্ত্রমুক্ত বিশ্বের স্বপ্ন এবং প্রায়োগিক দেয়া তার ভাষণ। ইসলামিক বিশ্বের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন : ২০০৯ সালে কায়রোতে তার ভাষণের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের সাথে পারস্পরিক শ্রদ্ধাভিত্তিক সম্পর্কের ভিত্তিতে একটি নতুন শুরুর আহ্বান। তবে এই পুরস্কার নিয়ে ব্যাপক সমালোচনাও ছিল। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ওবামার প্রকৃত অর্জনের আগেই তার দেয়া বক্তৃতার উপর ভিত্তি করেই এই পুরস্কার দেয়া হয়, যা ছিল অপরিণত। এমনকি ওবামাও তার বক্তৃতায় স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি যখন দুটি যুদ্ধ পরিচালনা করছেন, তখন এই পুরস্কার পাওয়া তার জন্য এক ধরনের বৈপরীত্য।
বহির্বিশ্বেও ওবামার জনপ্রিয়তা ছিল, বিশেষ করে তার মেয়াদের শুরুতে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের দাবি অনুযায়ী, বুশ আমলের তুলনায় ওবামার যুগে আমেরিকার ভাবমূর্তি অনেক উন্নত ছিল। আফ্রিকায় ওবামা ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। তার বাবার জন্মভূমি কেনিয়ায় ৮১ শতাংশ মানুষ তার প্রতি আস্থাশীল ছিল যা একটি রিপোর্ট দেখায়। আফ্রিকার মানুষ তাকে তাদের নিজের ভাই হিসেবে দেখত। তিনি আফ্রিকার উন্নয়ন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং এলজিবিটি অধিকারের জন্য একজন বন্ধু ছিলেন। তবে তার প্রশাসনের ড্রোন হামলা এবং সুদান বা ইরিত্রিয়ার মতো দেশগুলোর প্রতি নমনীয়তা নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে অসন্তোষ ছিল। এশিয়ায় ওবামার নীতি ছিল মূলত 'পিভট টু এশিয়া' বা এশিয়ার দিকে নজর দেওয়া। তিনি এশিয়াকে বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করে মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়াতে চেয়েছিলেন। চীন ও জাপান প্রসঙ্গে, পূর্ব এশিয়ায় চীনের আধিপত্য রুখতে তিনি জাপান ও ভারতের সাথে সামরিক সম্পর্ক গভীর করেন। তবে চীনের সাথে তার সম্পর্ক ছিল প্রতিযোগিতামূলক ও সহযোগিতার এক জটিল মিশ্রণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, ইন্দোনেশিয়ায় শৈশব কাটানোর কারণে তার বিশেষ জনপ্রিয়তা ছিল। তবে মালয়েশিয়া বা ভিয়েতনামের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করতে গিয়ে তিনি সেখানকার মানবাধিকার পরিস্থিতি উপেক্ষা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ও ওশেনিয়ার জনগণের কাছে ওবামা মূলত একজন স্থিতিশীল এবং আদর্শবাদী নেতা ছিলেন। ২০১২ সালে মার্কিন নির্বাচনের সময় অস্ট্রেলিয়ার পত্রিকাগুলো তাকে 'কিনে নেওয়া যায় না এমন আমেরিকার ধারক বলে বর্ণনা করেছিল।
ওবামার সমালোচনা কেবল তার বৈদেশিক নীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেও অনেক মানুষ তাকে পছন্দ করতেন না এবং তার তীব্র সমালোচনা করতেন। ওবামা আমেরিকার বিভক্ত রাজনীতি দূর করার প্রতিশ্রুতি দিলেও তার আমলেই রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে দূরত্ব ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে তার অনুমোদন হার ৮৩ শতাংশ ছিল, রিপাবলিকানদের মধ্যে তা ছিল মাত্র ১৩ শতাংশ। ২০১৩ সালে এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা দলিল থেকে জানা যায়, ওবামা প্রশাসন এনএসএ-র মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ফোন এবং ইন্টারনেট ডাটা ব্যাপকভাবে সংগ্রহ করছে। ওবামা শুরুতে এটি মেনে নিলেও পরে তীব্র সমালোচনার মুখে কিছু সংস্কার আনতে বাধ্য হন। এমনকি জার্মানি ও ব্রাজিলের মতো মিত্র দেশগুলোর নেতাদের ফোন ট্যাপ করার অভিযোগে আমেরিকার আন্তর্জাতিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। ওবামা প্রশাসন রেকর্ড সংখ্যক মানুষকে (প্রায় ৩ মিলিয়ন) দেশ থেকে নির্বাসিত করে, যা অভিবাসী অধিকার কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ওয়াল স্ট্রিটের ব্যাংকগুলিকে বাঁচানোর জন্য সরকারি অর্থ ব্যয় করা হলেও সাধারণ মানুষের ঋণের বোঝা বা কর্মসংস্থান সংকট দূর না হওয়ায় অনেক প্রগতিশীল মানুষ মনে করেন।
বারাক ওবামার ড্রোন যুদ্ধের ব্যাপকতা এবং বৈদেশিক নীতিতে অপ্রকাশিত সামরিক হস্তক্ষেপ তাকে আন্তর্জাতিক আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। ওবামা এমন একজন প্রেসিডেন্ট ছিলেন যিনি বর্ণবাদ এবং রাজনৈতিক বৈষম্যের দেয়াল ভাঙতে চেয়েছিলেন। তিনি হয়ত তার সকল স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি এবং অনেক ক্ষেত্রে তার সিদ্ধান্ত বিতর্কিত ছিল, তবে আধুনিক ভূ-রাজনীতি এবং আমেরিকান ইতিহাসে তার প্রভাব অনস্বীকার্য। প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার উপস্থিতি নিজেই একটি শক্তিশালী বার্তা ছিল, যা আগামী বহু প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা এবং সমালোচনামূলক পর্যালোচনার উৎস হয়ে থাকবে। শেষ পর্যন্ত, বারাক ওবামা তার রাষ্ট্রপতিত্বকে 'একটি ত্রুটিযুক্ত কিন্তু উন্নতির পথে ধাবমান ইউনিয়ন' গড়ার প্রক্রিয়া হিসেবে দেখিয়েছিলেন, যা আজও বিশ্বজুড়ে আলোচিত।