অনুসন্ধান করুন

অ্যাডাম স্মিথের "জাতির সম্পদ" এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব


অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপ যখন শিল্পবিপ্লবের সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে, তখন মানবসমাজের উৎপাদন, বাণিজ্য ও রাষ্ট্রচিন্তার ভেতরে এক গভীর রূপান্তরের প্রয়োজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে অ্যাডাম স্মিথ রচিত জাতির সম্পদ আধুনিক অর্থনৈতিক চিন্তার ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে আবির্ভূত হয়। গ্রন্থটি কেবল তৎকালীন অর্থনৈতিক কাঠামোর বিশ্লেষণই নয়, বরং মানুষের শ্রম, নৈতিকতা, স্বাধীনতা ও সামাজিক কল্যাণকে একসূত্রে গাঁথা এক সুসংহত দার্শনিক কাঠামো। স্মিথ দেখিয়েছেন যে একটি জাতির প্রকৃত সম্পদ সোনা-রুপার ভাণ্ডারে নয়, বরং তার মানুষের শ্রমশক্তি, উৎপাদনক্ষমতা এবং সেই উৎপাদনের ধারাবাহিক প্রবাহে নিহিত।

স্মিথের চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে শ্রম। মানুষের শ্রমই মূল্য সৃষ্টির মূল উৎস—এই ধারণা তিনি সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। শ্রমের বিভাজন উৎপাদনশীলতার বিস্ময়কর বৃদ্ধি ঘটাতে পারে—এ কথা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি কারখানাভিত্তিক উৎপাদনের বাস্তব উদাহরণ ব্যবহার করেন। একই কাজকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধাপে ভাগ করে বহু শ্রমিকের মধ্যে বণ্টন করলে দক্ষতা বাড়ে, সময় সাশ্রয় হয় এবং নতুন যন্ত্র ও কৌশলের উদ্ভাবন সম্ভব হয়। এর ফলে উৎপাদন বহুগুণে বৃদ্ধি পায়, যা সামগ্রিকভাবে সমাজের ভোগক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করে। তবে স্মিথ এই প্রক্রিয়ার অন্ধ প্রশংসায় থেমে থাকেননি। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে অতিমাত্রায় একঘেয়ে কাজ শ্রমিকের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে সংকুচিত করতে পারে। তাই উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি মানবিক বিকাশ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি জোর দিয়ে বলেন।

মুক্ত বাজার অর্থনীতির আলোচনায় স্মিথের সবচেয়ে আলোচিত ধারণা হলো ‘অদৃশ্য হাত’। এই ধারণার মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ব্যক্তি যখন নিজের স্বার্থে কাজ করে, তখন প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থার ভেতর দিয়েই সে অনিচ্ছাকৃতভাবে সমাজের সামগ্রিক কল্যাণে অবদান রাখে। ব্যক্তিগত লাভের আকাঙ্ক্ষা উৎপাদককে উন্নতমানের পণ্য উৎপাদনে, দক্ষতা বাড়াতে এবং ন্যায্য মূল্যে পণ্য সরবরাহে উদ্বুদ্ধ করে। মূল্যসংকেত ও প্রতিযোগিতা বাজারকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে—কোথায় উৎপাদন বাড়বে, কোথায় কমবে, কোন খাতে পুঁজি প্রবাহিত হবে—এই সিদ্ধান্তগুলো কোনো কেন্দ্রীভূত কর্তৃপক্ষ ছাড়াই গৃহীত হয়। তবে স্মিথ স্পষ্ট করে বলেন, এই ব্যবস্থা কার্যকর হতে হলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা, ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন অপরিহার্য।

তৎকালীন প্রচলিত বনর্কবাদী অর্থনৈতিক মতবাদের বিরুদ্ধে স্মিথের অবস্থান ছিল দৃঢ় ও যুক্তিনিষ্ঠ। বনর্কবাদ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, রপ্তানি উৎসাহ এবং আমদানি নিরুৎসাহের মাধ্যমে ধনসম্পদ সঞ্চয়কে মুখ্য মনে করত। স্মিথ এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শূন্য-সম খেলা নয়; বরং মুক্ত বাণিজ্যের মাধ্যমে সব পক্ষই লাভবান হতে পারে। প্রতিটি দেশ তার তুলনামূলক সুবিধা অনুযায়ী উৎপাদনে বিশেষায়িত হলে সামগ্রিক উৎপাদন বাড়ে এবং ভোক্তারা সস্তা ও মানসম্মত পণ্য লাভ করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলে।

পুঁজি সঞ্চয় ও বিনিয়োগ স্মিথের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। তিনি মনে করতেন, মিতব্যয়িতা ও সঞ্চয় সামাজিকভাবে কল্যাণকর, কারণ সঞ্চিত পুঁজি নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ায় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। উৎপাদনশীল শ্রম সেই শ্রম, যা পুনরায় বিক্রয়যোগ্য পণ্য সৃষ্টি করে এবং পুঁজির ভাণ্ডার বৃদ্ধি করে। এই পার্থক্য নিরূপণের মাধ্যমে তিনি অর্থনীতির কাঠামোগত বিশ্লেষণকে আরও গভীরতা দেন। যদিও আধুনিক অর্থনীতিতে সেবা খাতের গুরুত্ব স্বীকৃত, তবু স্মিথের এই বিশ্লেষণ পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থার প্রাথমিক যুক্তি বোঝার ক্ষেত্রে আজও তাৎপর্যপূর্ণ।

রাষ্ট্রের ভূমিকা সম্পর্কে স্মিথের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভারসাম্যপূর্ণ। তিনি অবাধ বাজারের পক্ষে থাকলেও রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় মনে করেননি। জাতীয় প্রতিরক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং এমন সব জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো নির্মাণ যেগুলো ব্যক্তিগতভাবে লাভজনক না হলেও সমাজের জন্য অপরিহার্য এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা তিনি অপরিহার্য বলে মনে করেন। বিশেষত শিক্ষা ও অবকাঠামোয় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগকে তিনি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখেছেন।

স্মিথের অর্থনৈতিক চিন্তা তার নৈতিক দর্শন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। মানুষের আচরণ কেবল স্বার্থপরতায় চালিত নয়—সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধও মানবচরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাজারের লেনদেনও আসলে একটি সামাজিক সম্পর্ক, যেখানে বিশ্বাস ও নৈতিকতা ভেঙে পড়লে পুরো ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি স্মিথের চিন্তাকে নিছক অর্থনৈতিক তত্ত্বের গণ্ডি ছাড়িয়ে একটি সমন্বিত সামাজিক দর্শনে উন্নীত করেছে।

দাসপ্রথার বিরুদ্ধে স্মিথের অবস্থান ছিল যুগান্তকারী। তিনি নৈতিক যুক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখান যে দাসশ্রম মুক্ত শ্রমের তুলনায় কম উৎপাদনশীল ও বেশি ব্যয়বহুল। স্বাধীন শ্রমিক নিজের উন্নতি ও ভবিষ্যতের আশায় কাজ করে, যা উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। এই যুক্তি পরবর্তী দাসপ্রথা-বিরোধী আন্দোলনে শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে স্মিথের চিন্তা নানা সমালোচনার মুখে পড়েছে। মহামন্দার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে বাজার সব সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থিতিশীল থাকে না এবং কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। আবার আধুনিক আচরণগত অর্থনীতি মানুষের অযৌক্তিকতা ও আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্তের দিকটি তুলে ধরেছে। তবুও এসব সমালোচনা স্মিথের মৌলিক অবদানকে খাটো করেনি; বরং তার চিন্তাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা ও সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

স্মিথ দেখিয়েছেন যে একটি সমাজ তখনই প্রকৃত অর্থে সমৃদ্ধ হতে পারে, যখন তার অধিকাংশ মানুষ মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে সক্ষম হয়। আজকের বৈশ্বিক অর্থনীতির জটিল বাস্তবতায়ও এই মানবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের জন্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও অনুপ্রেরণাদায়ক।

বিভাগ:
লেখকগণ: